‘Made in Bangladesh’ পোশাকের আড়ালে শ্রমিকের জীবনের গল্প

ফাতিহা আয়াত একজন বাংলাদেশি তরুণী, যিনি জাতিসংঘের মঞ্চে শিশু অধিকার ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।সম্প্রতি ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন,
যে শ্রমিকের হাতে তৈরি পোশাক বিদেশের অভিজাত বিপণিবিতানের শোভা বাড়ায়, সেই শ্রমিকের নিজের সন্তানের জন্য একটি নতুন জামা কেনার সামর্থ্য কতটুকু, সে প্রশ্নও আমাদের করা প্রয়োজন।
পৃথিবীর নানা প্রান্তে যখন কোনো মানুষ ‘Made in Bangladesh’ লেখা পোশাক গায়ে জড়ান, তখন হয়তো তিনি জানেনও না, সেই পোশাকের প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশের কোনো এক শ্রমজীবী মানুষের ঘাম, কোনো মায়ের সন্তানের জন্য অপেক্ষা, কোনো বাবার সংসার বাঁচানোর সংগ্রাম কিংবা কোনো তরুণীর স্বপ্ন।
যাঁদের হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাক পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, যাঁদের নিরলস পরিশ্রমে দেশে আসে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা, আজ সেই মানুষগুলোর একটি বড় অংশ ন্যায্য মজুরির দাবিতে রাজপথে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়। এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক। সংখ্যাগুলো শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়, এগুলো লাখো পরিবারের বেঁচে থাকার গল্প, সন্তানের লেখাপড়ার স্বপ্ন আর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার এক অনন্য ইতিহাস।
যে মা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যের পোশাক সেলাই করেন, দিন শেষে নিজের সন্তানের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে পারেন কি না, সেটিও আমাদের জাতীয় অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হওয়া উচিত।
কারণ একটি দেশের অর্থনীতি কতটা বড় হলো, তার পাশাপাশি সেই অর্থনীতিকে যাঁরা বড় করলেন, তাঁদের জীবন কতটা সুন্দর হলো, সেটিও উন্নয়নের পরিচয়।
আশার বিষয়, সরকার ইতিমধ্যেই মজুরি বোর্ড গঠন করে শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন প্রয়োজন শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে আন্তরিক আলোচনা, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত এবং পারস্পরিক আস্থা। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় যেমন বিবেচনায় নিতে হবে, তেমনি শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও গুরুত্ব পেতে হবে।
আজ আমাদের সামনে সুযোগ এসেছে এমন একটি সমাধানের, যেখানে শ্রমিক পাবেন মর্যাদাপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা, উদ্যোক্তারা পাবেন স্থিতিশীল শিল্পপরিবেশ এবং বাংলাদেশ ধরে রাখতে পারবে বিশ্ববাজারে তার অর্জিত অবস্থান।
যে মানুষগুলো বাংলাদেশের পোশাক দিয়ে পৃথিবীকে সাজিয়ে তুলছেন, তাঁদের নিজেদের জীবনও একটু সুন্দর হোক। যাঁদের শ্রমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয়, তাঁদের ঘরেও স্বস্তি ও সমৃদ্ধির আলো পৌঁছাক। যাদের ঘাম দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, তাঁদের চোখের জল যেন আমাদের সমৃদ্ধির মূল্য না হয়।
বাংলাদেশের প্রকৃত সাফল্য শুধু ‘Made in Bangladesh’ লেখা কোটি কোটি পোশাক বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়ায় নয়, সেই পোশাকের পেছনে থাকা লাখো মানুষের জীবনেও মর্যাদা, নিরাপত্তা ও স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করায়।




