খুন-নিখোঁজ-ডাকাতির খবরে উদ্বিগ্ন বানিয়াচংবাসী

প্রতিবেদন হবিগঞ্জ
বিশেষ প্রতিবেদক হঠাৎ করেই যেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে হবিগঞ্জের ভাটি অঞ্চলখ্যাত বানিয়াচং উপজেলা। গত এক মাসে উপজেলাটিতে চারটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সংঘর্ষ, ডাকাতি ও শিশু নিখোঁজের ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। এসব ঘটনায় নিখোঁজ শিশুকে উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, গ্রাম্য আধিপত্য বিস্তার, জায়গা-সম্পত্তি এবং পূর্ববিরোধকে কেন্দ্র করেই বেশিরভাগ সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। তবে পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তারা নিয়মিত কাজ করছে এবং এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বানিয়াচং উপজেলার মন্দরি গ্রামে জায়গা-সম্পত্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একই গ্রামের আব্দুল মজিদ, সারোয়ার ও তাদের লোকজনের সঙ্গে বিরোধ চলে আসছিল। এরই জেরে গত ১৮ সেপ্টেম্বর জায়দুল মিয়া (২৭) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে কুপিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। নিহত জায়দুল মিয়া মন্দরি গ্রামের লোকমান মিয়ার ছেলে।
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর উপজেলার পুকড়া ইউনিয়নের কাটখাল গ্রামে নারীদের গোসলের ছবি তোলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এতে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন। ঘটনার পরদিন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আহত রজব আলী।
১৪ সেপ্টেম্বর উপজেলার খাগাউড়া ইউনিয়নের কুর্শা খাগাউড়া গ্রামে হাওরে জমির আগাছা পরিষ্কারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে কৃষক তাহির মিয়া (৪৮) নিহত হন। তিনি কুর্শা খাগাউড়া গ্রামের মৃত তাজিম উল্লাহর ছেলে। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হন।
এছাড়া হাওরে মাছ ধরাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত তোফাজ্জুল মিয়া (৩০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ সেপ্টেম্বর মারা যান। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তোফাজ্জুল মিয়া উপজেলার ৩ নম্বর দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়নের ঠাকুরাইন দিঘির পূর্ব পাড় এলাকার মৃত মতিবুর রহমানের ছেলে।
অন্যদিকে, ১ অক্টোবর শিশু-কিশোরদের ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে রাতের আঁধারে টর্চ জ্বালিয়ে ছয় মহল্লাবাসীর মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। এ সময় বেশ কয়েকটি যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়।
শুধু সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ড নয়, বানিয়াচংয়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছে স্থানীয় একটি মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী ফাবিয়া তাবাসসুম মীম (১০)। দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তার কোনো সন্ধান মেলেনি। মীম উপজেলার ১ নম্বর উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের চতুরঙ্গ রায়ের পাড়া এলাকার খোয়াজ আলী মিয়ার মেয়ে। তাকে উদ্ধারের দাবিতে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হলেও এখনো তার সন্ধান দিতে পারেনি পুলিশ।
অপরদিকে, উপজেলা সদরে ইতালি প্রবাসী ফুল মিয়ার বাড়িতে দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা ১০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তবে এখন পর্যন্ত লুট হওয়া মালামাল উদ্ধার কিংবা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পারেনি পুলিশ।
স্থানীয়রা বলছেন, ভাটির এই জনপদে একের পর এক খুন, সংঘর্ষ, শিশু নিখোঁজ ও ডাকাতির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপরতা থাকলে পরিস্থিতির এমন অবনতি হতো না। বিশেষ করে নিখোঁজ শিশু মীমকে দ্রুত উদ্ধার এবং হত্যাকাণ্ড ও ডাকাতির ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বানিয়াচংয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গ্রাম্য বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় হতে হবে। একই সঙ্গে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি নিখোঁজ শিশু মীমকে উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ বলেন, ‘এই এলাকার মানুষের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামা একটু বেশি হয়। তবে পুলিশ বিষয়গুলো তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেককে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।’
নিখোঁজ শিশু মীম প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ‘এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।’
সোর্স হবিগঞ্জ দিনরাত




