বুড়িগঙ্গায় সাকার মাছের দখল: জেলেদের ক্ষতি, নদীর হুমকি, এখন করণীয় কী?

বুড়িগঙ্গাসহ দেশের জলাশয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নিষিদ্ধ সাকার মাছ। জেলেদের জাল ছিঁড়ছে, দেশীয় মাছ কমছে। নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই মাছ পশুখাদ্য বা ফিশমিলে কাজে লাগানো যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণার তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
বুড়িগঙ্গা নদীতে সাকার মাছের (সাকারমাউথ ক্যাটফিশ) সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। স্থানীয় জেলেদের ভাষ্য, জাল ফেললে এখন শিং-মাগুরের চেয়ে এই মাছই বেশি ওঠে। অনেকের জাল ছিঁড়ে যাচ্ছে, কেউ আবার মাছের কাঁটা ও শক্ত আবরণে আহতও হচ্ছেন।
কোথা থেকে এল এই মাছ
সাকার মাছের আদি বাস দক্ষিণ আমেরিকায়। বাংলাদেশে এটি ১৯৮০-এর দশকে শৌখিন অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ হিসেবে আনা হয়েছিল। পরে মানুষের অসাবধানতায় বা ছেড়ে দেওয়ার কারণে এটি প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। উন্মুক্ত জলাশয়ে এর প্রথম নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় ২০০৮ সালে। এই মাছ দূষিত ও কম অক্সিজেনের পানিতেও টিকে থাকতে পারে, দ্রুত বাড়ে এবং কম বয়সেই বংশবিস্তার শুরু করে। বুড়িগঙ্গার মতো দূষিত নদী তাই এদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ।
ক্ষতির দিক
গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সাকার মাছ খাবার ও জায়গা নিয়ে দেশীয় মাছের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, মাছের ডিম খেয়ে ফেলে এবং দেশীয় প্রজাতিকে সরিয়ে দেয়। একই ধরনের পরিবেশে কার্প মাছের উৎপাদন প্রায় ২০ শতাংশ কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। জেলেদের জীবিকাও হুমকিতে পড়ছে, কারণ এই মাছ সাধারণত কেউ খায় না, বাজারেও চাহিদা নেই। মৎস্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালকের মতে, মাছটি জলাশয়ের তলায় থাকে এবং তলায় জমা ভারী ধাতুর সংস্পর্শে আসে, যা পরিবেশের জন্য উদ্বেগজনক।
সরকারি পদক্ষেপ
এই ক্ষতির কথা বিবেচনা করে সরকার সাকার মাছ নিষিদ্ধ করেছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী এই মাছ আমদানি, চাষ, পরিবহন, বিক্রি, সরবরাহ ও সংরক্ষণ করা যাবে না। নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নদীতে মাছটির সংখ্যা কমেনি।
এখন করণীয় কী
বিশেষজ্ঞ ও গবেষণার সুপারিশের ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, বুড়িগঙ্গা ও অন্যান্য জলাশয়ে নিয়মিত নজরদারি এবং কোথায় কতটা ছড়িয়েছে তার জরিপ। দ্বিতীয়ত, জাল, ফাঁদ ও অন্যান্য পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রিতভাবে মাছ তুলে ফেলা, যেখানে জেলেদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, অ্যাকোয়ারিয়ামের মাছ নদী-খালে না ছাড়ার বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতা এবং পোষা মাছের দোকানে কড়া তদারকি। চতুর্থত, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ গবেষকদের নেতৃত্বে টেকসই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি।
পশুখাদ্য বা ক্যাট ফুডে ব্যবহারের সম্ভাবনা
তোলা মাছ শুধু ফেলে না দিয়ে কাজে লাগানোর (আপসাইকলিং) ধারণা নিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গবেষণা শুরু হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার একটি গবেষণায় সুলাওয়েসির একটি হ্রদের সাকার মাছকে মাছের খাদ্য উপকরণ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, এবং সেখানে ক্যাডমিয়াম ও সিসার মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যে পাওয়া গেছে। এ থেকে ফিশমিল, পশুখাদ্য বা পোষা প্রাণীর খাবার তৈরির সম্ভাবনার ইঙ্গিত মেলে।
তবে বুড়িগঙ্গার মতো অত্যন্ত দূষিত নদীর মাছে ভারী ধাতুর মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। বাংলাদেশে এই মাছের পুষ্টি ও ভারী ধাতুর ওপর স্বাস্থ্যঝুঁকি বিশ্লেষণ হয়েছে, কিন্তু বুড়িগঙ্গার মাছকে সরাসরি পশুখাদ্যে ব্যবহারের নিরাপত্তা এখনো প্রমাণিত নয়। তাই ব্যবহারের আগে ল্যাবে ভারী ধাতু ও দূষণ পরীক্ষা, তাপে প্রক্রিয়াজাত করার মান এবং সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন। পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে এগোনোই নিরাপদ পথ।
সারকথা
সাকার মাছ শুধু একটি মাছের সমস্যা নয়, এটি নদীর বাস্তুতন্ত্র ও জেলেদের জীবিকার সংকট। নিয়ন্ত্রণ, গবেষণা ও সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া একে ঠেকানো কঠিন।




